নিজস্ব প্রতিবেদক:
নীলফামারীর প্রত্যন্ত জনপদ ডিমলার ডালিয়া গ্রামের এক লড়াকু সন্তান ড. মোঃ জামিনুর রহমান তার অদম্য মেধা ও শ্রম দিয়ে দেশের জন্য এক গৌরবোজ্জ্বল সাফল্য বয়ে এনেছেন। দীর্ঘ পাঁচ বছরের নিরলস গবেষণায় তিনি গবাদি পশু ও মানুষের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ রোগ ‘ব্রুসেলসিস’ (Brucellosis) প্রতিরোধের কার্যকর ভ্যাকসিন আবিষ্কার করতে সক্ষম হয়েছেন। সম্প্রতি বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (বাকৃবি), ময়মনসিংহ থেকে তিনি এই কৃতিত্বপূর্ণ ডক্টরেট (পিএইচডি) ডিগ্রি অর্জন করেন।
ড. জামিনুর রহমানের গবেষণার মূল বিষয় ছিল স্থানীয় ব্রুসেলা আইসোলেট থেকে ইনঅ্যাক্টিভেটেড ভ্যাকসিন তৈরি করা। বাংলাদেশ একাডেমি অব সায়েন্স (BAS) এবং ইউনাইটেড স্টেট ডিপার্টমেন্ট অব এগ্রিকালচার (USDA)-এর অর্থায়নে পরিচালিত এই গবেষণাটি দেশের প্রাণিসম্পদ খাতে নতুন এক আশার আলো দেখিয়েছে। তার এই উদ্ভাবন কেবল পশুর স্বাস্থ্য নয়, বরং দুগ্ধ শিল্প ও জনস্বাস্থ্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। গবেষণায় তাকে দিকনির্দেশনা দিয়েছেন প্রখ্যাত গবেষক প্রফেসর ড. মোঃ আরিফুল ইসলাম ও প্রফেসর ড. মোছাঃ মিনার খাতুন।
১৯৮৬ সালে এক সাধারণ পরিবারে জন্ম নেওয়া জামিনুর রহমানের পথচলা ছিল প্রতিকূলতায় ঘেরা। ডালিয়া বাইশপুকুর প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শুরু করে রংপুর পুলিশ লাইন্স স্কুল ও হাজি মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত তার শিক্ষা জীবনের প্রতিটি ধাপে ছিল কঠোর পরিশ্রমের ছাপ। পারিবারিক অসচ্ছলতা তাকে দমাতে পারেনি। গ্রামীণ ব্যাংকের শিক্ষা ঋণ ও বিভিন্ন বৃত্তির সহায়তায় তিনি তার পড়াশোনা চালিয়ে যান। কর্মজীবনের শুরুতেই তিনি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ফার্ম ম্যানেজার হিসেবে যোগ দেন, কিন্তু উচ্চশিক্ষার প্রতি প্রবল তৃষ্ণা তাকে গবেষণাগার পর্যন্ত টেনে নিয়ে যায়।
ড. জামিনুর রহমানের জীবন এক অদ্ভুত সংগ্রামের সাক্ষী। তিনি পরপর তিনটি বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েও চূড়ান্ত তালিকায় স্থান পাননি। কিন্তু এই ‘ব্যর্থতা’ তাকে আরও বড় সাফল্যের দিকে ঠেলে দেয়। কর্পোরেট জগতের উচ্চ বেতনের চাকরির হাতছানি উপেক্ষা করে কেবল শিক্ষকতার প্রতি পরম টানে তিনি ২০১৫ সালে সাভারের গণ বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন। বর্তমানে তিনি সেখানে সহকারী অধ্যাপক, এনিম্যাল প্রোডাকশন বিভাগের বিভাগীয় প্রধান এবং সহকারী প্রক্টর হিসেবে কর্মরত আছেন।
গবেষণা ও পাণ্ডিত্যের স্বীকৃতি স্বরূপ তিনি ইতিমধ্যে নেপাল, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, চীন ও পাপুয়া নিউগিনির মতো দেশে আন্তর্জাতিক সেমিনারে অংশ নিয়েছেন। এমনকি জার্মানির বন বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চতর গবেষণার সুযোগও পেয়েছিলেন তিনি।
ডালিয়া গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত কিন্তু সাধারণ কৃষক পরিবার থেকে উঠে আসা এই বিজ্ঞানীর সাফল্য এখন স্থানীয় তরুণদের মুখে মুখে। বাবা মোঃ হাবিবুর রহমান ও মা মোছাঃ সাহেরা বেগমের এই সুযোগ্য সন্তান প্রমাণ করেছেন যে, প্রবল ইচ্ছাশক্তি আর ধৈর্য থাকলে যেকোনো বাধা ডিঙিয়ে লক্ষ্যে পৌঁছানো সম্ভব।
ড. মোঃ জামিনুর রহমান তার এই অর্জনের জন্য মহান আল্লাহর প্রতি শুকরিয়া আদায়ের পাশাপাশি তার শিক্ষক, পরিবার এবং অর্থায়নকারী সংস্থাগুলোর প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। তার এই সংগ্রাম ও সাফল্য আগামী প্রজন্মের জন্য এক অনন্য পথনির্দেশক হয়ে থাকবে।